পর্ব ৩: রক্তমাংসের অলিখিত ঋণ ও গোপন ক্ষত

অধ্যায় ৩১শৈশবের বন্ধু ও অচেনা কুশলবিনিময়

বহু বছর পর দেখা হওয়া বন্ধুর সাথে মেকি হাসি দিয়ে কথা বলা ও হারিয়ে যাওয়া সারল্য

৪ মিনিট পাঠ

রাস্তার মোড়ে বা কোনো শপিং মলের চলন্ত সিঁড়িতে হঠাৎ চোখাচোখি হতেই দুজনেই থমকে দাঁড়ালাম। প্রথম দুই সেকেন্ডের চমক কাটতেই মুখে ফুটে উঠল এক চওড়া হাসি: আরে তুই! কতদিন পর দেখা! হাত মেলানো হলো, কাঁধে চাপড় দেওয়া হলো, কিন্তু ঠিক ত্রিশ সেকেন্ড পার হওয়ার পরেই দেখা গেল, আমাদের আসলে আর বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

অথচ এই মানুষটির সাথেই একসময় স্কুলের টিফিন ভাগ করে খাওয়া হয়েছে, সাইকেলের রডে বসে পুরো বিকেল টো টো করে ঘোরা হয়েছে, জীবনের প্রথম প্রেমের চিঠিটা তাকে দিয়েই লেখানো হয়েছিল। তখন আমাদের মাঝখানে কোনো পর্দা ছিল না। কার পকেটে কয় টাকা আছে, কার বাবার কী চাকরি, তা নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা ছিল না। আমরা কথা বলতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা, অকারণে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যেত।

কিন্তু আজ মাঝখানে কেটে গেছে পনেরো বা বিশটা বছর। আজ আমরা দুজনেই ভদ্রলোক হয়ে গেছি। কথা বলার সময় আমাদের চোখ অবচেতনেই একে অপরের ঘড়ির ব্র্যান্ড, জুতোর চামড়া আর পোশাকের দাম জরিপ করে নিচ্ছে। আমরা খুব মেপে মেপে নিজেদের সাফল্যের কথা বলছি, সংসারের গল্প করছি, আর খুব সচেতনভাবে নিজেদের ব্যর্থতা ও দুঃখগুলোকে আড়াল করে রাখছি। সেই পুরনো তুই-তোকারিটা আছে ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরকার আত্মাটা কবেই মরে গেছে।

পাঁচ মিনিটের এই অচেনা কুশলবিনিময় শেষে আমরা আবার ফোন নাম্বার আদান-প্রদান করি এবং বলি, একদিন বসতে হবে কিন্তু, লম্বা আড্ডা দেব। দুজনেই খুব ভালো করে জানি, সেই একদিন আর কোনোদিন আসবে না, কেউ কাউকে ফোনও করবে না। ভিড়ের ভেতর আবার আলাদা হয়ে হাঁটার সময় বুকের ভেতরটা কেবল একটু চিনচিন করে ওঠে; বন্ধুকে হারানোর দুঃখে নয়, বরং নিজেদের সেই নিষ্পাপ ও হিসাবহীন শৈশবটা চিরতরে মরে গেছে, সেই শোকের ভারে।