অধ্যায় ০৪বৃষ্টির দিনে যাকে মনে পড়ে
জানলার গ্রিলে হাত রেখে চা খাওয়া এবং স্মৃতির অতল গহ্বর
দুপুরের পর আকাশটা হঠাৎ কালো করে যখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নামে, তখন ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত অন্ধকার তৈরি হয়। জানলার ঠান্ডা লোহার গ্রিলে কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়ালে বৃষ্টির ছাঁট এসে চোখেমুখে লাগে, আর ঠিক তখনই বুকের ভেতর কোনো এক পুরনো কবর থেকে মৃত মানুষের মতো একটি মুখ নড়েচড়ে ওঠে। হাতে ধরা চায়ের কাপটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে জলের মতো হয়ে যায়, তবু চুমুক দেওয়ার কথা মনে থাকে না।
রোদের দিনগুলোতে মানুষ বড় ব্যস্ত থাকে। অফিসের ফাইল, মাসের বাজারের হিসাব, বাসার ইলেকট্রিক বিল, এসবের ভিড়ে স্মৃতিগুলো মাথা তোলার সাহস পায় না। কিন্তু বৃষ্টি নামলেই শহরের যান্ত্রিক ঘড়িটা হঠাৎ অকেজো হয়ে পড়ে। টিনের চালে বা কার্নিশে জলের একটানা শব্দে মানুষের মনের সবগুলো তালা একসাথে খুলে যায়। তখন মনে পড়ে এমন একজনের কথা, যে হয়তো কোনো এক বাদলা দিনে রিকশার হুড তুলে পাশে বসেছিল, কিংবা ভেজা চুলে তোয়ালে জড়িয়ে বলেছিল, আজ আর বাইরে না গেলে হয় না?
মধ্যবিত্তের জীবন বড় অদ্ভুত। এখানে মানুষ শোক পালন করারও অবসর পায় না। কেবল এমন কোনো বর্ষণমুখর বিকেলে, যখন রাস্তায় জল জমে যায় এবং ঘরে ফেরার কোনো তাড়া থাকে না, তখন মানুষ নিজের কাছে নিজে ধরা পড়ে যায়। সে আবিষ্কার করে, যে মানুষটিকে সে দশ বছর আগে জীবন থেকে মুছে ফেলেছে বলে ভেবেছিল, সে আসলে বৃষ্টির গন্ধের সাথে মিশে ঘরের কোণেই লুকিয়ে ছিল। ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ নাকে গেলেই গলার কাছটা কেমন ধরে আসে।
বৃষ্টি থেমে গেলে শহরের রাস্তায় আবার গাড়ির হর্ন বাজে। মানুষটা তখন চোখ মুছে জানলা থেকে সরে আসে, ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চাটটুকু বেসিনে ঢেলে ফেলে আবার সংসারের কাজে মন দেয়। কেউ জানতেও পারে না, এই আধঘণ্টার বৃষ্টির ভেতর মানুষটা একাই তার ফেলে আসা জীবনের পুরোটা পথ আরও একবার হেঁটে এসেছে। কিছু মানুষ আমাদের জীবনে বৃষ্টির মতোই আসে; তারা ঘর বাঁধে না, শুধু আজীবন ভিজিয়ে দিয়ে চলে যায়।