অধ্যায় ০১ঠোঁটের কিনারে থমকে থাকা নাম
কিছু ভালোবাসা প্রকাশ না করার কারণেই আজীবন অক্ষত থেকে যায়
একটি নাম উচ্চারণ করতে মানুষের ঠিক কতটুকু বাতাসের প্রয়োজন হয়? অথচ ফুসফুস ভরা বাতাস নিয়েও কিছু নাম আমৃত্যু ঠোঁটের কিনারে এসে পাথর হয়ে আটকে থাকে। সামনের মানুষটি যখন চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে খুব সাধারণভাবে জিজ্ঞেস করে, কিছু বলবে নাকি, তখন হঠাৎ করেই জিভটা তালুর সাথে আঠার মতো লেগে যায়, কান দুটো গরম হয়ে ওঠে আর বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটার শব্দ শোনা যায়।
জীবনে এমন কিছু সন্ধ্যা আসে, যখন মনে হয় আজ সব বলে দেওয়া যাবে। চারপাশের আলো মরে আসে, দুজন মানুষের মাঝখানের নীরবতা ঘন হয়ে ওঠে, আর ঠিক তখনই বুকের খাঁচা থেকে একটিমাত্র বাক্য পাখা ঝাপটাতে শুরু করে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গিয়ে মানুষ হেরে যায়। সে তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, আজ বাতাসটা বেশ ঠান্ডা, তাই না? এই একটিমাত্র তুচ্ছ বাক্যের নিচে চাপা পড়ে যায় দশ বছরের জমানো হাহাকার। সামনের মানুষটি কোনোদিন জানতেও পারে না, মাত্র তিন সেকেন্ড আগে তার সামনে বসে থাকা মানুষটি নিজের ভেতরে কী ভয়ংকর এক ভূমিকম্প সামলে নিল।
কেন আমরা বলতে পারি না? লোকে বলবে প্রত্যাখ্যানের ভয়। কিন্তু সত্যটা আরও অনেক গভীর। মানুষ যখন কাউকে নিঃশব্দে ভালোবাসে, তখন সেই মানুষটির ওপর তার একচ্ছত্র অধিকার থাকে। সেখানে কোনো ঝগড়া নেই, কোনো শর্ত নেই, কোনো ছেড়ে যাওয়ার ভয় নেই। কিন্তু যেই মুহূর্তে আপনি বলে ফেলবেন, অমনি সেই পবিত্র অনুভূতিটি নেমে আসবে পৃথিবীর ধুলোকাদায়। তখন সেখানে হিসেব ঢুকবে, সামাজিকতা ঢুকবে এবং একদিন সব ফুরিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক ঢুকবে।
তাই কিছু মানুষ প্রকাশের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে নীরবতার নিরাপদ অন্ধকার বেছে নেয়। তারা জানে, বলে ফেললে যা হয়তো দুদিন পরেই সাধারণ অভ্যাসে মলিন হয়ে যেত, না বলার কারণে তা আজীবন প্রথম দিনের মতোই তীব্র ও অমলিন থেকে যাবে। ঠোঁটের কিনারে থমকে থাকা সেই নামগুলো কোনোদিন বাতাসে ভাসে না ঠিকই, কিন্তু মানুষের প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে তারা রক্তের ভেতর নীরবে চলাচল করে।