পর্ব ৩: রক্তমাংসের অলিখিত ঋণ ও গোপন ক্ষত

অধ্যায় ৩৩মৃত মানুষের রেখে যাওয়া ঘড়ি

জড়বস্তু বেঁচে থাকে অনন্তকাল, শুধু রক্তের মানুষটি এক নিমেষে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়

৪ মিনিট পাঠ

মানুষটাকে হাসপাতাল থেকে সাদা কাপড়ে মুড়ে শ্মশানে বা কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আজ তিন দিন হলো, অথচ তার টেবিলের ওপর রাখা হাতঘড়িটা এখনো টিকটিক করে নির্বিকারভাবে চলেছে। ঘড়িটার চামড়ার বেল্টে এখনো তার হাতের ঘামের গন্ধ লেগে আছে, তার কব্জির মাপে বেল্টের নির্দিষ্ট ছিদ্রটা একটু চওড়া হয়ে আছে। ওই চলমান কাঁটাটার দিকে তাকালে মাথার ভেতরটা কেমন গুলিয়ে ওঠে; মনে হয় জড়বস্তুর কী অসীম পরমায়ু, আর রক্তমাংসের মানুষের জীবন কী ভয়ংকর ঠুনকো!

প্রিয়জন চলে যাওয়ার পর সবচেয়ে বড় অত্যাচার শুরু করে তার রেখে যাওয়া জিনিসপত্রগুলো। আলনায় ঝোলানো তার আধা-ময়লা জামাটা, বাথরুমে রাখা তার টুথব্রাশটা, বিছানার পাশে রাখা তার চটির জোড়া, এগুলো যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না যে তাদের মালিক আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। জিনিসগুলো ঠিক যেভাবে সে রেখে গিয়েছিল, সেভাবেই বোবার মতো পড়ে থেকে তার ফেরার অপেক্ষা করতে থাকে।

আমরা তখন ভয়ে ওই ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখি। কারণ জামাটাতে হাত দিলেই মনে হয়, এই তো, সে বুঝি পাশের ঘর থেকেই বেরিয়ে এসে বলবে, ওটাতে হাত দিচ্ছিস কেন? আমরা তার জিনিসগুলো কাউকে দিয়ে দিতেও পারি না, আবার চোখের সামনে সহ্যও করতে পারি না। একটি প্লাস্টিকের চিরুনি বা একটি কাঁচের চায়ের কাপ অনায়াসে পঞ্চাশ বছর বেঁচে থাকে, অথচ যে মানুষটি সেগুলো ব্যবহার করত, সে এক নিমেষে বাতাসে কর্পূরের মতো উবে যায়।

একসময় টেবিলের ওপর রাখা সেই ঘড়িটার ব্যাটারিও ফুরিয়ে যায়। কাঁটাটা কোনো এক অবেলায় চিরকালের মতো থমকে দাঁড়ায়। আমরা তখন ঘড়িটা তুলে একটা বাক্সের ভেতর ভরে আলমারির সবচেয়ে অন্ধকার কোণে লুকিয়ে রাখি। মানুষের স্মৃতিও একদিন ওই বন্ধ ঘড়ির মতোই বাক্সবন্দি হয়ে যায়; শুধু মাঝেমধ্যে আলমারি খুললে তার ভেতর থেকে এক টুকরো হিমশীতল শূন্যতা বাইরে ঝাঁপিয়ে পড়ে।