পর্ব ৪: নৈঃশব্দ্যের দর্শন, আত্ম-কৌতুক ও মুক্তি

অধ্যায় ৩৭ফাঁপা বাঁশির গভীর সুর

অন্তরের শূন্যতাই মূলত নতুন সুর তৈরি করে, অভাব না থাকলে সংগীত জন্মায় না

৪ মিনিট পাঠ

বুকের ভেতরটা যখন একদম ফাঁকা হয়ে যায়, যখন মনে হয় ভেতরে আর কোনো মাংস নেই, রক্ত নেই, কেবল একটা শূন্য গহ্বর হাঁ করে আছে, তখন নিঃশ্বাস নিলেও ভেতর থেকে একটা শোঁ শোঁ শব্দ হয়। আমরা এই শূন্যতাকে ভয় পাই, একে ভরাট করার জন্য চারপাশের সস্তা কোলাহল আর মানুষের ভিড়কে আঁকড়ে ধরতে চাই। অথচ আমরা ভুলে যাই, বাঁশের ভেতরটা সম্পূর্ণ ফাঁপা না হলে তার ভেতর দিয়ে কখনো বাঁশির সুর বাজে না।

একটি নিরেট বাঁশখণ্ড কেবল লাঠি হিসেবেই কাজ করতে পারে, তা দিয়ে কারো মাথা ফাটানো যায়, কিন্তু গান তৈরি করা যায় না। যখন কারিগর সেই বাঁশের ভেতরকার সমস্ত শাঁস কুরে কুরে বের করে তাকে সম্পূর্ণ শূন্য করে দেয় এবং তার গায়ে আগুনের শলাকা দিয়ে একের পর এক ক্ষত বা ছিদ্র তৈরি করে, তখনই কেবল সামান্য ফুঁ দিলে তার ভেতর থেকে স্বর্গীয় সংগীত ঝরে পড়ে।

মানুষের জীবনও ঠিক ওই বাঁশির মতোই। যে মানুষ জীবনে কখনো কোনো কিছু হারায়নি, যার সব চাওয়া পূর্ণ হয়েছে, তার ভেতরটা ভরাট ও নিরেট হয়ে থাকে। সে সুখী হতে পারে, কিন্তু তার ভেতর কোনো গভীরতা থাকে না, কোনো সুর থাকে না। অন্যদিকে যে মানুষটি বারবার প্রতারিত হয়েছে, যার প্রিয়জন তাকে ছেড়ে চলে গেছে, যার বুকের ভেতর অসংখ্য না-পাওয়ার ছিদ্র তৈরি হয়েছে, সে-ই কেবল অন্যের দুঃখের ভাষা বুঝতে পারে।

তাই নিজের ভেতরকার এই শূন্যতাকে নিয়ে আর আক্ষেপ করার কিছু নেই। আমাদের এই অভাব, আমাদের এই একাকিত্বই আমাদের আত্মাকে ফাঁপা বাঁশিতে রূপান্তরিত করেছে। পৃথিবীর বাতাস যখন আমাদের ওই ক্ষতগুলোর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন আমাদের দীর্ঘশ্বাসও হয়ে ওঠে একেকটি নিভৃত কবিতা।