পর্ব ৩: রক্তমাংসের অলিখিত ঋণ ও গোপন ক্ষত

অধ্যায় ২৯ক্ষমা না পাওয়ার চিরস্থায়ী খামতি

মানুষটি চলে যাওয়ার পর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষমা প্রার্থনার ব্যর্থ চেষ্টা

৪ মিনিট পাঠ

মাটির ঢিবির ওপর গজিয়ে ওঠা কচি ঘাসের দিকে তাকিয়ে কিংবা শ্মশানের ঠান্ডা ছাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ যখন মনে মনে বলে, আমাকে মাফ করে দিয়ো, তখন বাতাসে কেবল শুকনো পাতার খসখস শব্দ ছাড়া আর কোনো উত্তর আসে না। কানের পর্দা ফেটে যায় সেই নিস্তব্ধতার চিৎকারে, আর মানুষ বুঝতে পারে, পৃথিবীতে কিছু ভুল সংশোধনের মেয়াদ চিরকালের মতো ফুরিয়ে গেছে।

মানুষ যখন বেঁচে থাকে, তখন আমরা তাকে চিরস্থায়ী বলে ধরে নিই। রাগের মাথায় আমরা তাকে কত নিষ্ঠুর কথা শোনাই, কতবার তার সাথে খারাপ ব্যবহার করি, তার ডাকে সাড়া না দিয়ে দরজা বন্ধ করে রাখি। আমরা ভাবি, সময় তো পড়ে আছে, পরে একদিন মান ভাঙিয়ে নেওয়া যাবে, পরে একদিন ক্ষমা চেয়ে নেওয়া যাবে। আমাদের এই পরে-র অহংকার যে কতটা ঠুনকো, তা মৃত্যু এসে এক নিমেষে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

মৃত মানুষের সাথে ঝগড়া করা যায় না, আবার মৃত মানুষের কাছ থেকে ক্ষমাও আদায় করা যায় না। জীবিত মানুষ আঘাত পেলে হয়তো গাল ফুলিয়ে বসে থাকে, আমরা তার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদলে সে হয়তো একসময় মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, যা, মাফ করে দিলাম। কিন্তু যে মানুষটি মাটির নিচে বা আকাশের তারায় বিলীন হয়ে গেছে, সে আমাদের সমস্ত অনুশোচনার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়।

এই যে ক্ষমা না পাওয়ার চিরস্থায়ী খামতি, এর চেয়ে বড় কোনো শাস্তি মানুষের জীবনে হতে পারে না। মানুষ তখন ধর্মকর্মে মন দেয়, দান-খয়রাত করে, কিন্তু মাঝরাতে যখন ঘুম ভেঙে যায়, তখন ঠিকই মনে পড়ে সেই নির্দিষ্ট দিনটির কথা, যেদিন মানুষটার চোখে জল দেখেও সে মুখ ফিরিয়ে চলে এসেছিল। নিজের বিবেকের আদালতে মানুষ তখন আজীবন এক জামিন-অযোগ্য আসামি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।