অধ্যায় ০৯অপ্রাপ্তির নিজস্ব নান্দনিকতা
পেয়ে গেলে প্রেমের মৃত্যু হতো, না-পাওয়ার শূন্যতাই শিল্পের জন্ম দেয়
কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা হাতের মুঠোয় চলে আসার পর মানুষের চোখে যে ক্লান্তি ও শূন্যতা নেমে আসে, তার চেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য খুব কমই আছে। যে মানুষটিকে পাওয়ার জন্য আমরা রাতের পর রাত জায়নামাজে বা মন্দিরের চাতালে মাথা খুঁড়েছি, তাকে নিজের করে পাওয়ার বছরখানেক পরেই দেখা যায়, তার উপস্থিতিতে আর বুকের ভেতর কোনো স্পন্দনই জাগে না। প্রাপ্তির সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো, তা মানুষের কল্পনাকে হত্যা করে।
আমরা যা পাই, তাকে প্রতিদিনের বাস্তবতার ধুলোবালি মাখতে হয়। যাকে দূর থেকে দেখে মনে হতো কোন ভিনগ্রহের অপ্সরা বা দেবদূত, এক ছাদের নিচে বসবাস শুরু করলে তার নাক ডাকার শব্দ, তার চায়ের কাপ না ধোয়ার অভ্যাস কিংবা তার সংসারী হিসাব-নিকাশ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে সেও আমাদের মতোই অতি সাধারণ এক রক্তমাংসের মানুষ। পাওয়ার সাথে সাথেই রহস্যের পর্দাটি ছিঁড়ে যায়, আর রহস্য ফুরিয়ে গেলে প্রেম পরিণত হয় নিছক এক সামাজিক অভ্যাসে।
অন্যদিকে যাকে আমরা প্রাণপণে চেয়েও পাইনি, সময়ের সাধ্য নেই তার গায়ে হাত দেওয়ার। না-পাওয়া মানুষটি চিরকাল আমাদের স্মৃতিতে তার সবচেয়ে সুন্দর বয়সটি নিয়ে বেঁচে থাকে। তাকে কখনো বৃদ্ধ হতে হয় না, তাকে কখনো আমাদের সাথে বাজারের ফর্দ নিয়ে ঝগড়া করতে হয় না। আমাদের কল্পনার রংতুলিতে সে প্রতিদিন আরও বেশি নিখুঁত, আরও বেশি মায়াবী হয়ে ওঠে।
পৃথিবীর সমস্ত মহৎ কবিতা, গান ও চিত্রকলার জন্ম হয়েছে এই না-পাওয়ার গর্ভ থেকেই। মানুষ যদি তার সব প্রার্থনার ফল পেয়ে যেত, তবে পৃথিবীতে কোনো শিল্প থাকত না, থাকত কেবল তৃপ্ত মানুষের ঢেকুর তোলার শব্দ। আমাদের বুকের ভেতর যে না-পাওয়ার ক্ষতটি আছে, সেটিই আমাদের ভেতরকার আকাশটাকে বড় করে রাখে। পেয়ে গেলে যা হয়তো প্রতিদিনের অভ্যাসে পচে যেত, কেবল না-পাওয়ার কারণেই তা আমাদের আত্মার ভেতর নক্ষত্রের মতো চিরকাল জ্বলজ্বল করে।