পর্ব ৩: রক্তমাংসের অলিখিত ঋণ ও গোপন ক্ষত

অধ্যায় ২৪মায়ের আঁচলে শেষ মিষ্টির গন্ধ

মায়ের নিঃশব্দ সেবা, যা আমরা অধিকার বলে ধরে নিয়েছিলাম

৪ মিনিট পাঠ

রান্নাঘরের গরম ভাপের ভেতর দাঁড়িয়ে মা যখন সুতির শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতেন, তখন সেই আঁচল থেকে হলুদ, জিরে আর ঘামের মেশানো এক অদ্ভুত গন্ধ বেরোত। ছোটবেলায় সেই আঁচলের তলায় মুখ লুকালেই পৃথিবীর সমস্ত ভয় কেটে যেত। আজ বড় হওয়ার পর দামি পারফিউমের গন্ধে ঘর ম-ম করে, কিন্তু মাঝরাতে জ্বর এলে কপালে হাত রাখার মতো সেই হলুদ-মাখা খসখসে হাতটা আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

সন্তানেরা মায়ের ভালোবাসাকে বাতাসের মতোই স্বাভাবিক ও বিনামূল্যে পাওয়া এক অধিকার বলে ধরে নেয়। মা মানেই তো সবার শেষে খাবেন, মা মানেই তো পাতিলের তলায় লেগে থাকা পোড়া ভাতটুকু চেঁচেপুচে খাবেন আর বলবেন, ওতেই আমার বেশি তৃপ্তি। মা মানেই তো টিভির সামনে বসে ঢুলতে ঢুলতে আমাদের বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় জেগে থাকবেন। আমরা কোনোদিন ভেবেও দেখিনি, এই মানুষটিরও একটি নিজস্ব নাম ছিল, তারও একসময় শৈশব ছিল, তারও কখনো কখনো সব কাজ ফেলে রেখে আকাশ দেখার ইচ্ছে হতো।

বাড়িতে ভালো কোনো খাবার বা মিষ্টি এলে মা সবসময় বলতেন, তোরা খা, আমার মিষ্টি খেলে দাঁতে ব্যথা করে। আমরাও কী নির্লজ্জের মতো তা বিশ্বাস করে গোগ্রাসে গিলে ফেলতাম। বয়স বাড়ার পর একদিন হঠাৎ আবিষ্কার করি, মা আসলে মিষ্টি খেতে ভীষণ ভালোবাসতেন; কেবল আমাদের ভাগে কম পড়বে বলে তিনি আজীবন নিজের জিভকে শাসন করে গেছেন।

মা যখন চলে যান কিংবা বার্ধক্যে পৌঁছে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন, তখন ডাইনিং টেবিলে সাজানো মিষ্টির বাটির দিকে তাকালে গলা দিয়ে আর এক কণা খাবারও নামে না। মনে হয়, মায়ের রক্ত আর মাংস তিলে তিলে চুরি করেই আমরা আজ এত বড় হয়েছি, অথচ তার ঋণের এক কণাও কোনোদিন শোধ করা হলো না।