অধ্যায় ৪২প্রকৃতির মৌন পাঠশালা
ঝরাপাতার মতো নিঃশব্দে চলে যাওয়া এবং প্রকৃতির নিয়মে বিলীন হওয়া
শীতের দুপুরে পুকুরপাড়ে বা পার্কের বেঞ্চে একা বসে থাকলে দেখা যায়, গাছের ডাল থেকে একটা হলুদ পাতা কোনো বাতাস ছাড়াই হঠাৎ খসে পড়ল। সে ডালের সাথে ঝুলে থাকার জন্য কোনো কান্নাকাটি করল না, নিচে পড়ার সময় কোনো চিৎকার করল না; শুধু হাওয়ায় দুলে দুলে খুব শান্তভাবে মাটির বুকে শুয়ে পড়ল। এইটুকু দৃশ্যের ভেতর যে কী বিশাল দর্শন লুকিয়ে আছে, তা বুঝতে মানুষের পুরো একটা জীবন লেগে যায়।
প্রকৃতিতে কোথাও কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো আঁকড়ে ধরার লোভ নেই। নদী জানে তাকে সমুদ্রে গিয়ে বিলীন হতে হবে, তাই সে পথে কোনো পাথরের সাথে স্থায়ী ঘর বাঁধে না। ফুল জানে বিকেলেই তার পাপড়ি ঝরে যাবে, তবু সে সকালে ফোটার আনন্দটুকু থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে না। কেবল মানুষই তার ক্ষুদ্র মুঠোর ভেতর সবকিছু চিরকালের জন্য আটকে রাখতে চায়। সে যৌবন ধরে রাখতে চায়, মানুষ ধরে রাখতে চায়, ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়, আর পারে না বলেই তার এত হাহাকার।
যখন মানুষের কথায় আর মন ভরে না, যখন মানুষের স্বার্থপরতা দেখতে দেখতে চোখ ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন এই বৃক্ষ, নদী আর আকাশের মৌন পাঠশালায় এসে বসতে হয়। একটি বিশাল বটগাছের নিচে দাঁড়ালে মনে হয়, সে যেন আমাদের মাথায় হাত রেখে বলছে, এত ছটফট করছিস কেন রে বোকা? সবই তো একদিন মাটিতে মিশে যাবে।
প্রকৃতির এই বিশাল নীরবতার সাথে নিজের নিঃশ্বাস মেলাতে পারলে মৃত্যুর ভয়ও কেটে যায়। তখন মনে হয়, আমাদের এই আসা এবং যাওয়া আসলে একই ঋতুচক্রের অংশ। সময় হলে ওই হলুদ পাতাটার মতোই কোনো অভিযোগ না রেখে, কোনো শোরগোল না তুলে নিঃশব্দে ডাল ছেড়ে ঝরে পড়তে পারাটাই হলো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সমাপ্তি।