পর্ব ২: নাগরিক ক্লান্তি, মুখোশ ও নীল আলোর ফাঁদ

অধ্যায় ১৫মাঝরাতের ট্রাফিকে পথ হারানো মানুষ

চেনা শহরের রাজপথে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় নিজেকে ঠিকানাহীন মনে হওয়া

৪ মিনিট পাঠ

রাত এগারোটার পর শহরের ফ্লাইওভারের ওপর যখন গাড়ির লম্বা লাইন থমকে দাঁড়ায়, তখন সামনের গাড়ির লাল ব্রেক-লাইটের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। জানলার কাঁচ নামালে পোড়া ডিজেলের গন্ধ আর গরম বাতাস এসে মুখে ঝাপটা মারে। চারপাশে হাজার হাজার মানুষ বাড়ি ফেরার জন্য ছটফট করছে, হর্ন বাজাচ্ছে, অথচ সেই তীব্র কোলাহলের মাঝখানে বসে হঠাৎ মনে হয়, এই শহরে আমার আসলে ফিরে যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই।

পকেটে বাড়ির চাবি আছে, মানিব্যাগে ঠিকানা লেখা পরিচয়পত্র আছে, তবু মানুষকে মাঝেমধ্যে এমন এক অস্তিত্বগত বিস্মৃতি গ্রাস করে। ত্রিশ বছর ধরে যে রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করা হয়েছে, সোডিয়াম বাতির হলুদ আলোয় সেই চেনা মোড়টাকেই হঠাৎ সম্পূর্ণ অচেনা কোনো ভিনগ্রহের পথ বলে ভ্রম হয়। মনে হয়, আমি এখানে কেন বসে আছি? আমি কোথা থেকে এলাম আর কোথায়ই বা যাচ্ছি?

নাগরিক জীবন মানুষকে এক অদ্ভুত ইঁদুরদৌড়ের ভেতর আটকে রাখে। সকাল আটটায় বেরোনো আর রাত দশটায় ফেরা, এই যান্ত্রিক বৃত্তের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে মানুষ ভুলে যায় সে আসলে কী চেয়েছিল। ট্রাফিক সিগন্যালের লাল বাতির নিচে যখন দশ মিনিটের জন্য জীবনটা থমকে দাঁড়ায়, তখনই সেই অবদমিত প্রশ্নগুলো অন্ধকার থেকে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। পাশের রিকশায় বসে থাকা ক্লান্ত মানুষটির মুখের দিকে তাকিয়ে তখন নিজের মুখটাই দেখতে পাওয়া যায়।

সিগন্যাল সবুজ হয়। পেছনের গাড়িগুলো কর্কশ শব্দে হর্ন বাজিয়ে তাড়া দেয়। পথ হারানো মানুষটি তখন আবার যন্ত্রের মতো সামনের দিকে এগিয়ে চলে। সে তার ইটের খাঁচায় ফিরে যায় ঠিকই, কিন্তু তার আত্মাটা ওই মাঝরাতের রাজপথে গাড়ির চাকার নিচেই কোথাও পিষ্ট হয়ে পড়ে থাকে।