অধ্যায় ৩০শূন্য ডাইনিং টেবিল ও নীরব দুপুর
ডাইনিং টেবিলের খালি চেয়ারগুলো যেভাবে পরিবারের অবলুপ্তির সাক্ষী হয়ে থাকে
দুপুর দুটোর সময় পুরনো বাড়ির ডাইনিং টেবিলটার দিকে তাকালে বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। ছয় চেয়ারের বিশাল কাঠের টেবিলটার পাঁচটি চেয়ারই এখন সারাক্ষণ টেবিলের তলায় সমান করে ঢোকানো থাকে, কেবল কোণের একটি চেয়ারে বসে একজন বৃদ্ধ বা নিঃসঙ্গ মানুষ নীরবে ভাত মেখে চলেছে। চামচে বা প্লেটে সামান্য শব্দ হলেও তা ফাঁকা ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে গম্ভীর প্রতিধ্বনি তোলে।
অথচ এই টেবিলটার গায়ে কান পাতলে আজও পনেরো বছর আগের দুপুরের কোলাহল শোনা যায়। তখন জায়গা পাওয়া যেত না বলে কাড়াকাড়ি হতো, মা রান্নাঘর থেকে গরম ভাত এনে পাতে দিতে দিতে হিমশিম খেতেন, বাবা খবরের কাগজ পড়তে পড়তে ধমক দিতেন, আর ভাইবোনদের হাসাহাসিতে পুরো বাড়িটা গমগম করত। টেবিলের কাঁচের নিচে আজও হয়তো সেই সময়ের কোনো পুরনো ক্যালেন্ডারের পাতা বা ছোটবেলার আঁকা স্টিকারের দাগ লেগে আছে।
একটি পরিবার কীভাবে মরে যায়? কোনো বোমার আঘাতে নয়, কোনো মহামারিতেও নয়; পরিবার মরে যায় ডাইনিং টেবিলের চেয়ারগুলো একে একে খালি হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। প্রথমে একজন উচ্চশিক্ষার জন্য শহর ছাড়ে, তারপর কারো বিয়ে হয়ে যায়, কেউ চাকরি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়, আর শেষে একদিন মাথার ওপরের বটগাছের মতো মানুষগুলো ছবি হয়ে দেয়ালে ঝুলে পড়ে।
যারা চলে যায়, তারা তাদের নতুন শহরে নতুন টেবিল কিনে নেয়। কিন্তু যে মানুষটি পুরনো ভিটেয় একা পড়ে থাকে, তার কাছে প্রতিটি দুপুর আসে এক ভয়ংকর শোকযাত্রার মতো। সে খালি চেয়ারগুলোর দিকে তাকিয়ে একা একা গিলতে থাকে। ভাতের দলা গলায় আটকে যায়, জলের গ্লাস হাতে নিয়ে সে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকে, আর ভাবে, এতগুলো মানুষ কোথায় হাওয়ায় মিলিয়ে গেল যে আজ এক বাটি ডাল ভাগ করে খাওয়ার মতোও কেউ রইল না?