অধ্যায় ৩২অলিখিত ঋণ যা শোধ হয় না
মানুষ আমাদের ভালোবাসায় যা দিয়েছিল, স্বার্থপরতার কারণে আমরা তার কিছুই ফিরিয়ে দিতে পারিনি
ব্যাংকের ঋণ বা দোকানের বাকি খাতার হিসাব একদিন না একদিন কড়ায়-গণ্ডায় মিটিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু জীবনের পথে হাঁটতে গিয়ে কিছু মানুষের কাছ থেকে আমরা এমন কিছু নিঃশর্ত মায়া ও আশ্রয় গ্রহণ করি, যার কোনো রসিদ থাকে না। আমাদের চরম দুঃসময়ে যারা নিজেদের উজাড় করে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল, আমাদের সুদিন আসার পর আমরা যাদের খুব সুবিধাজনকভাবে ভুলে গেছি, তাদের মুখগুলো হঠাৎ মধ্যরাতে মনে পড়লে লজ্জায় কান দুটো পুড়ে যেতে চায়।
মানুষ স্বভাবতই বড় আত্মকেন্দ্রিক ও বিস্মৃতিপ্রবণ প্রাণী। যখন তার পায়ের নিচে মাটি থাকে না, যখন সে শহরের মেসে একা জ্বরে ধুঁকতে থাকে কিংবা বেকারত্বের গ্লানিতে ডুবে থাকে, তখন হয়তো কোনো এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়, কোনো এক সাদাসিধে বন্ধু কিংবা কোনো এক প্রেমিকা তাকে নিঃস্বার্থভাবে আগলে রাখে। নিজের টিউশনির টাকা ভেঙে তার হাতে গুঁজে দেয়, রাত জেগে তার মাথায় জলপটি দেয়। তখন মনে হয়, এই মানুষটির ঋণ আমি জীবন দিয়েও শোধ করব।
কিন্তু মানুষের অবস্থা যখন ফেরে, যখন সে বড় চাকরি পায়, নতুন গাড়ি কেনে এবং উঁচুতলার সমাজে উঠতে-বসতে শুরু করে, তখন সেই পুরনো ও মলিন মানুষগুলোকে তার নতুন স্ট্যাটাসের সাথে আর মানানসই মনে হয় না। সে তখন ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে তাদের ফোন ধরা কমিয়ে দেয়, তাদের এড়িয়ে চলে। ওই সরল মানুষগুলো কোনো অনুযোগ করে না; তারা কেবল দূর থেকে মুচকি হেসে নিজেদের গুটিয়ে নেয়।
জীবনের শেষভাগে এসে, যখন সব কোলাহল থেমে যায়, তখন মানুষের মনে পড়ে সেই অলিখিত ঋণের খতিয়ান। তখন পকেটে প্রচুর টাকা থাকে, ক্ষমতা থাকে, কিন্তু সেই মানুষগুলোকে খুঁজে পাওয়া যায় না, কিংবা পেলেও দেখা যায় তাদের আর আমাদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই। স্বার্থপরতার যে কালি আমরা নিজের গায়ে মাখিয়েছি, পৃথিবীর কোনো গঙ্গাজলেই তা আর ধুয়ে ফেলা যায় না।