অধ্যায় ১৩নীল পর্দার আলো ও অভুক্ত আত্মা
হাজার ভার্চুয়াল বন্ধুর ভিড়ে একাকী ঘরের নিস্তব্ধতা
রাত আড়াইটের সময় ঘরের সব আলো নিভিয়ে দেওয়ার পর কেবল মুঠোফোনের নীলচে আলোটুকু এসে পড়ে মুখের ওপর। চোখ দুটো জ্বালা করছে, ঘাড়ের রগগুলো টনটন করছে, তবু বৃদ্ধাঙ্গুলিটা এক যান্ত্রিক নিয়মে স্ক্রিনের নিচ থেকে ওপরের দিকে ঘষে চলেছে। একের পর এক অপরিচিত মানুষের হাসিমুখ, খাবারের ছবি, ভ্রমণের ভিডিও চোখের সামনে দিয়ে ভেসে যাচ্ছে, আর আমাদের পেটের ভেতরকার শূন্যতাটা ক্রমশ এক অতল কুয়োর রূপ নিচ্ছে।
আধুনিক মানুষ আর অন্ধকারে একা থাকতে পারে না। নীরবতাকে সে বাঘের চেয়েও বেশি ভয় পায়। কারণ ফোনটা রেখে চোখ বন্ধ করলেই মাথার ভেতর নিজের জীবনের না-পাওয়াগুলো, নিজের ব্যর্থতাগুলো চিৎকার করে কথা বলতে শুরু করে। সেই নিজস্ব অন্ধকারের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমরা আশ্রয় নিই এই ছয় ইঞ্চি কাঁচের পর্দার ভেতর। আমরা ভাবি, আমরা বুঝি পৃথিবীর সাথে যুক্ত আছি। অথচ চারপাশের এই নিস্তব্ধ ঘরে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোনো দ্বিতীয় মানুষের অস্তিত্ব নেই।
তালিকায় হয়তো তিন হাজার বন্ধু জ্বলজ্বল করছে। সবুজ বাতিগুলো জানান দিচ্ছে অনেকেই এখনো জেগে আছে। কিন্তু হঠাৎ যদি বুকের ভেতর খুব ভয় করে, যদি মনে হয় এই মুহূর্তে কারো কণ্ঠস্বর না শুনলে দম আটকে আসবে, তখন পুরো তালিকাটা উপর-নিচ করেও এমন একটি নাম খুঁজে পাওয়া যায় না যাকে নিঃসংকোচে কল করা যায়। সবাই সবার প্রদর্শনী নিয়ে ব্যস্ত, কারো ভাঙচুর দেখার সময় কারো নেই।
অভুক্ত আত্মা নিয়ে আমরা রাতের পর রাত এই নীল আলোর সমুদ্রে সাঁতার কাটি। তৃষ্ণার্ত মানুষ যেমন মরীচিকার পেছনে ছুটে গলা ভিজাতে চায়, আমরাও তেমনি ভার্চুয়াল কোলাহলের ভেতর মানুষের স্পর্শ খুঁজি। শেষরাতে ফোনটা যখন হাত থেকে বুকের ওপর খসে পড়ে, তখন দেখা যায় ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে গেছে, আর তার সাথে ফুরিয়ে গেছে আমাদের আরও একটি জীবন্ত রাতের আয়ু।