পর্ব ৩: রক্তমাংসের অলিখিত ঋণ ও গোপন ক্ষত

অধ্যায় ২৬ভাইবোনের মাঝের নীরব দেওয়াল

এক শৈশবের স্মৃতি বুকে নিয়ে প্রাপ্তবয়সে অচেনা পরবাসী হয়ে যাওয়া

৪ মিনিট পাঠ

যাদের সাথে একসময় এক লেপের নিচে পা গলিয়ে শীতের রাত কেটেছে, এক প্লেট থেকে কাড়াকাড়ি করে মায়ের হাতের মাখা ভাত খাওয়া হয়েছে, আজ তারাই যখন আমাদের ড্রয়িংরুমে এসে মেহমানের মতো সোফার কোণে জড়সড় হয়ে বসে, তখন বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। কথার মাঝখানে বারবার ছেদ পড়ে, আমরা আবহাওয়া বা রাজনীতির কথা বলে সেই অস্বস্তিকর নীরবতাটুকু ঢাকার চেষ্টা করি।

একই মায়ের পেট থেকে জন্ম নেওয়া ভাইবোনরা যে বড় হওয়ার পর কীভাবে একে অপরের কাছে সম্পূর্ণ অচেনা পরবাসী হয়ে যায়, তা প্রকৃতির এক নিষ্ঠুর রহস্য। শৈশবে আমাদের কোনো আলাদা অস্তিত্ব ছিল না; আমাদের সুখ-দুঃখ, আমাদের লুকানো খেলনা, বাবার ভয়ে আমাদের একসাথে লুকিয়ে থাকা, সবই ছিল যৌথ। মনে হতো পৃথিবী উল্টে গেলেও এই বন্ধন কোনোদিন আলগা হবে না।

কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রত্যেকের জীবনে আলাদা আলাদা সংসার আসে, আলাদা অর্থনৈতিক বাস্তবতা আসে। কারো অবস্থা ভালো হয়, কারো খারাপ। তখন নিজেদের অজান্তেই সম্পর্কের মাঝখানে ঢুকে পড়ে তুলনা, ঈর্ষা ও আনুষ্ঠানিকতা। আগে যেখানে না বলেই ভাইয়ের আলমারি থেকে শার্ট বের করে পরা যেত, আজ সেখানে তার বাড়িতে যাওয়ার আগে ফোন করে অনুমতি নিতে হয়। বোনের চোখের জল দেখলে আগে যে বুকটা কেঁপে উঠত, আজ সংসারের জটিল সমীকরণে সেই বোনের দিক থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিতে হয়।

পারিবারিক অনুষ্ঠানে বছরে দু-একবার যখন দেখা হয়, তখন সবাই খুব হাসিমুখে কথা বলে, ভালো খাবারের আয়োজন হয়। কিন্তু বিদায়ের সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে যখন চোখাচোখি হয়, তখন দুজনের চোখেই সেই ফেলে আসা শৈশবের ভূতটা উঁকি দেয়। দুজনেই জানে, মাঝখানের এই অদৃশ্য দেওয়ালটা আর কোনোদিন ভাঙবে না; আমরা এখন কেবলই একই নামের এবং একই অতীতের দুটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।