অধ্যায় ০৭পুরনো বইয়ের ভাঁজে শুকনো বকুল
একটি শুকনো ফুল কীভাবে বিশ বছর আগের কোনো এক বিকেলকে জীবন্ত করে রাখে
পুরনো আলমারি থেকে ধুলোপড়া বইটা টেনে নামাতেই ভেতর থেকে খয়েরি রঙের একটা শুকনো পাপড়ি ঝরে পড়ল মেঝের ওপর। নিচু হয়ে সেটি কুড়িয়ে নিতে গেলে আঙুলের চাপে পাপড়িটা গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, আর ঠিক সেই মুহূর্তে নাকে এসে লাগে পুরনো কাগজের গন্ধে মেশা এক অদ্ভুত ঘ্রাণ। সাথে সাথে মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করে ওঠে, আর চোখের সামনের বর্তমান ঘরবাড়ি সব মুছে গিয়ে ভেসে ওঠে বিশ বছর আগের কোনো এক ধূসর বিকেল।
মানুষ বড় অদ্ভুত প্রাণী। সে জানে ফুল পচে যাবে, মানুষ বদলে যাবে, সম্পর্ক একদিন ফুরিয়ে যাবে; তবু সে সময়ের স্রোতকে আটকানোর জন্য বইয়ের পাতার ভাঁজে ফুল লুকিয়ে রাখে। যেদিন ওই বকুল বা গোলাপটি বইয়ের পাতায় রাখা হয়েছিল, সেদিন হয়তো দুজন মানুষের চোখে ছিল রাজ্যের স্বপ্ন। হয়তো কথা ছিল সারা জীবন একসাথে কাটানোর। বইয়ের পাতা বন্ধ করে সেদিন তারা ভেবেছিল, তাদের ভালোবাসাটিকেও বুঝি এভাবেই অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষণ করা যাবে।
কিন্তু সময় কাউকে ক্ষমা করে না। বিশ বছরে পৃথিবীর ওপর দিয়ে কত ঝড় বয়ে গেছে। যে মানুষটি সেদিন ফুলটা হাতে তুলে দিয়েছিল, সে আজ হয়তো অন্য কারো সংসারের কর্তা বা গিন্নি। তার মাথার চুলে পাক ধরেছে, চোখের নিচে পড়েছে বয়সের ভাঁজ। রাস্তায় দেখা হলে হয়তো আজ আর চিনতেও পারবে না, কিংবা চিনলেও একগাল মেকি হেসে জিগ্যেস করবে, কেমন আছো? মানুষটি বেঁচে থেকেও কবেই মরে গেছে স্মৃতির পাতায়।
অথচ আশ্চর্য, জড়বস্তু হয়েও ওই শুকনো ফুলটি আজও নিজের জায়গায় ঠিকই রয়ে গেছে! তার রঙ চলে গেছে, তার রস শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে গেছে, তবু বইয়ের পাতায় সে এক স্থায়ী বাদামি ছাপ রেখে গেছে। পাতার ওপর আঙুল বোলালে সেই দাগটা আজও স্পষ্ট অনুভব করা যায়। মানুষ চলে যায়, ভালোবাসা কর্পূরের মতো উবে যায়, শুধু পুরনো বইয়ের ভাঁজে চাপাপড়া ওই শুকনো ফুলগুলো আমাদের বোকা ও নিষ্পাপ কৈশোরের নীরব সাক্ষী হয়ে একা একা বেঁচে থাকে।