অধ্যায় ৩৪রাত তিনটের আত্ম-কৌতুক
নিজের জীবনের সমস্ত ট্র্যাজেডিকে দূর থেকে দেখে এক চিলতে ম্লান হাসিতে উড়িয়ে দেওয়া
রাত তিনটের সময় যখন ঘুম আসে না এবং বুকের ভেতরকার পুরনো ব্যথাগুলো চিনচিন করতে শুরু করে, তখন হঠাৎ বিছানায় উঠে বসে নিজের অন্ধকার ছায়াটার দিকে তাকালে ফিক করে একটা হাসি পেয়ে যায়। কোনো আনন্দের হাসি নয়, এক অদ্ভুত তিক্ত অথচ নির্ভার আত্ম-কৌতুকের হাসি। মনে হয়, বাপরে বাপ, এই সামান্য দুই দিনের জীবনে কী বিশাল ট্র্যাজেডির নায়কই না ভেবেছি নিজেকে!
সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লেখার সেই মানুষগুলোর মতো আমরা যখন নিজেদের দুঃখের ঘর থেকে এক পা বাইরে বেরিয়ে এসে নিজেদের দিকে তাকাই, তখন আমাদের সমস্ত কান্নাগুলোকে বড় কৌতুকপূর্ণ বলে মনে হয়। কে আমাকে ভালোবাসল না, কে আমার সাথে প্রতারণা করল, কোন পরীক্ষায় বা চাকরিতে আমি প্রথম হতে পারলাম না, তাই নিয়ে তিরিশটা বছর ধরে বালিশ ভিজিয়ে কী মহৎ কাজটাই না করেছি! মহাবিশ্বের এই অনন্ত নাট্যমঞ্চে আমাদের এই ব্যক্তিগত হাহাকার আসলে মশার গুনগুনানির চেয়েও তুচ্ছ।
মানুষ যতক্ষণ নিজেকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়, ততক্ষণই সে কষ্ট পায়। যেই মুহূর্তে সে বুঝতে পারে যে সে আসলে প্রকৃতির এক অতি সাধারণ কৌতুক ছাড়া কিছুই নয়, অমনি তার কাঁধ থেকে মণকে মণ বোঝা নেমে যায়। নিজের বোকামি, নিজের অন্ধ বিশ্বাস এবং নিজের বারবার ঠকে যাওয়ার ইতিহাসটাকে তখন আর শোকগাথা মনে হয় না; মনে হয় চার্লি চ্যাপলিনের কোনো নির্বাক সিনেমার দৃশ্য।
রাত তিনটের ওই নিস্তব্ধতায় বসে নিজের ব্যর্থতাগুলোকে নিয়ে নিজেই যখন একটু হাসা যায়, তখন বুকের ভেতরকার জমাট বাঁধা পাথরটা হঠাৎ গলে জল হয়ে যায়। আমরা তখন বুঝতে পারি, দুঃখকে জয় করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র কান্না নয়, বরং নিজের ক্ষুদ্রতাকে চিনতে পারা এবং নিজের ভাঙাচোরা জীবনের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে ম্লান হাসি হাসতে পারা।