অধ্যায় ০৬নক্ষত্রের নিচে একা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ
মানুষ কতটা নিঃসঙ্গ হলে আকাশের তারাদের সাথে নিজের দুঃখের তুলনা করে
শীতের রাতে ছাদের কার্নিশে দাঁড়ালে মাথার ওপরের আকাশটাকে বড় নির্দয় মনে হয়। ঘাড় উঁচু করে তাকালে ঘাড়ে সামান্য ব্যথা করে, চোখ জ্বালা করে ঠান্ডা বাতাসে, তবু দৃষ্টি সরানো যায় না। হাজার হাজার বছর আগে মরে যাওয়া নক্ষত্রদের হিমশীতল আলো এসে যখন মানুষের মুখে পড়ে, তখন নিজের বুকের ভেতরকার ব্যক্তিগত দুঃখগুলোকে বড় তুচ্ছ ও হাস্যকর বলে মনে হয়।
মানুষের যখন পৃথিবীতে আর কারো কাছে যাওয়ার জায়গা থাকে না, যখন তার সমস্ত দীর্ঘশ্বাস ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে, তখনই সে ছাদে গিয়ে আকাশের নিচে দাঁড়ায়। জীবিত মানুষের কোলাহল থেকে পালিয়ে সে আশ্রয় খোঁজে মহাজাগতিক নীরবতার কাছে। জীবনানন্দ দাশ হয়তো এমন কোনো রাতেই ট্রামের লাইন ছেড়ে অন্ধকার মাঠে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। মানুষ ঠিক কতটা একা হলে রক্তমাংসের মানুষের বদলে কোটি আলোকবর্ষ দূরের জোনাকি-তারাদের সাথে নিজের নিঃসঙ্গতার তুলনা করতে পারে?
আমাদের এই আটপৌরে জীবনে কত তুচ্ছ জিনিস নিয়েই না আমরা প্রতিদিন রক্তারক্তি করি। কে আমাকে অপমান করল, কে আমার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিল না, কে আমাকে ছেড়ে অন্য কারো হাত ধরল, এসব ভেবে ভেবে আমাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। কিন্তু ওই অসীম অন্ধকার আকাশের নিচে একা দাঁড়ালে হঠাৎ এক অদ্ভুত বোধের জন্ম হয়। মনে হয়, এই পৃথিবীতে আমাদের আয়ু তো কেবল একটি দেশলাইয়ের কাঠির জ্বলে ওঠার মতো। এক নিমেষের আলো, তারপরেই সব ছাই।
তবু এই ক্ষুদ্র বুকের ভেতর কী বিশাল এক সমুদ্রের হাহাকার আমরা বয়ে বেড়াই! নক্ষত্ররা কোনো কথা বলে না, তারা কোনো সান্ত্বনা দেয় না। তারা কেবল নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু তাদের ওই বিশাল নীরবতার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে গলার ভেতর জমে থাকা কান্নার দলাটা ধীরে ধীরে গলে যেতে শুরু করে। আমরা বুঝতে পারি, নিঃসঙ্গতা কোনো অভিশাপ নয়; এই মহাবিশ্বের প্রতিটি গ্রহ, প্রতিটি নক্ষত্র এবং প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবেই চিরকাল একা।