পর্ব ২: নাগরিক ক্লান্তি, মুখোশ ও নীল আলোর ফাঁদ

অধ্যায় ১৪ভরসার জায়গায় প্রতারণার গন্ধ

প্রতারিত হলে পেটে যে ক্ষুধা লাগার মতো অনুভূতি হয় এবং গা গুলায়

৪ মিনিট পাঠ

খুব চেনা মানুষটি যখন মিথ্যে বলছে বলে প্রথমবার সন্দেহ হয়, তখন মস্তিষ্কের আগে আমাদের পেট তা টের পায়। নাভির ঠিক নিচে হঠাৎ করে এক অদ্ভুত ঠান্ডা মোচড় দিয়ে ওঠে, অনেকটা তীব্র ক্ষুধা লাগার মতো এক ফাঁকা অনুভূতি, অথচ খাবারের দিকে তাকালেই গলার কাছটায় বমি ঠেলে আসে। বিশ্বাস ভাঙার কোনো শব্দ হয় না, কিন্তু তার একটা কটু গন্ধ আছে যা নাকে লাগলে মানুষের সমস্ত শরীর অবশ হয়ে যায়।

মানুষ তো বাইরের শত্রুর হাতে প্রতারিত হয় না; মানুষ প্রতারিত হয় কেবল তারই হাতে, যার কোলে মাথা রেখে সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিল। যে মানুষটিকে আমরা আমাদের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাগুলো চিনিয়ে দিই, যাকে বলি, এই দেখো, এখানে আঘাত করলে আমি মরে যাব, ঠিক সেই মানুষটিই যখন একদিন খুব ঠান্ডা মাথায় ওই নির্দিষ্ট জায়গাটিতেই ছুরি বসিয়ে দেয়, তখন মানুষের আর কোনো ভাষা থাকে না। তখন চিৎকার করা যায় না, ঝগড়া করা যায় না; শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে হয়।

প্রতারিত হওয়ার পর মানুষ প্রথমে অন্য মানুষটিকে ঘৃণা করে না; সে ঘৃণা করতে শুরু করে নিজেকে। নিজের নির্বুদ্ধিতার কথা ভেবে তার লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে। সে তখন বাথরুমের বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার মুখে জলের ঝাপটা দেয়, গলার ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে বমি করে শরীরের ভেতরকার ওই নোংরা অনুভূতিটাকে উগরে দিতে চায়। কিন্তু আত্মার ভেতর যে বিষ ঢুকে গেছে, তা কি আর বমি করে বের করা যায়?

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই আঘাতের পর মানুষ আর কোনোদিন আগের মতো করে কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। সে তখন এক চিরস্থায়ী সন্দেহের চশমা পরে পৃথিবীতে হাঁটে। কেউ ভালোবেসে হাত বাড়ালেও তার মনে হয়, এর পেছনেও বোধহয় কোনো ফাঁদ পাতা আছে। ভরসার জায়গাটা একবার পচে গেলে মানুষ জীবিত থাকে ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরের শিশুসুলভ সারল্যটুকু চিরকালের মতো মরে কাঠ হয়ে যায়।