পর্ব ১: হেমন্তের পাণ্ডুলিপি ও অব্যক্ত প্রেম

অধ্যায় ১১শেষ বিকেলের চায়ের কাপে একাকীত্ব

চায়ের ধোঁয়া মিলিয়ে যাওয়ার মতো জীবনের সম্পর্কগুলোর নিঃশব্দ প্রস্থান

৪ মিনিট পাঠ

বিকেল পাঁচটার পর যখন রোদের রঙ মরে গিয়ে তামাটে হয়ে আসে, তখন খালি বারান্দায় একা বসে চা খেতে গেলে গলার ভেতরটা হু হু করে ওঠে। কাপের ওপর থেকে সাদা ধোঁয়াটুকু পাক খেয়ে উপরে ওঠে এবং মুহূর্তের মধ্যেই বাতাসে মিলিয়ে যায়। কাপের শেষ চুমুকটা দেওয়ার পর নিচে যেটুকু চিনির দানা ও চায়ের গাদ পড়ে থাকে, মানুষের মধ্যবয়সের জীবনটা ঠিক ওই তলানিটুকুর মতোই নিঃসঙ্গ ও স্বাদহীন।

একসময় এই বিকেলগুলো এমন ছিল না। তখন চায়ের টেবিল ঘিরে কত মানুষের কোলাহল ছিল, কত অপ্রয়োজনীয় তর্ক ছিল, কত হাসির রোল ছিল। মনে হতো এই মানুষগুলো বুঝি সারাজীবন এভাবেই পাশে বসে থাকবে। কিন্তু জীবনের নিয়ম বড় নিষ্ঠুর ও নীরব। কেউ ঝগড়া করে যায়নি, কেউ শত্রুতা করে বিদায় নেয়নি; কেবল সময়ের স্রোতে চায়ের কাপের ধোঁয়ার মতোই একে একে সবাই শূন্যে মিলিয়ে গেছে। কেউ চলে গেছে জীবিকার তাগিদে ভিনদেশে, কেউ ডুবে গেছে নিজের সংসারের জটিল অঙ্কে, আর কেউ কেউ কেবলই অভ্যাসের অভাবে অচেনা হয়ে গেছে।

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় যেমন বলতেন, মানুষ আসলে সারাজীবন ধরে কেবল বিদায়ের মহড়া দেয়। যৌবনে আমরা মানুষ জমা করি, আর বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই মানুষগুলোকে এক এক করে হাত ফসকে পড়ে যেতে দেখি। শেষ বিকেলের এই আলো-আঁধারির সময়টাতে মানুষ নিজের সেই রিক্ত হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে থাকে। ফোনবুকে শত শত নাম সেভ করা আছে, অথচ এই বিষণ্ণ বিকেলে ফোন করে, চলে আয়, চা খাব, বলার মতো একজন মানুষও আর অবশিষ্ট নেই।

তবু মানুষ প্রতিদিন বিকেলে নিয়ম করে চায়ের জল বসায়। দুটি কাপের বদলে একটি কাপে চা ঢালে। তারপর বারান্দার কোণে বসে সামনে রাখা খালি চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ চায়ে চুমুক দেয়। সম্পর্কগুলো যেভাবে নিঃশব্দে প্রস্থান করেছে, মানুষও ঠিক সেভাবেই কোনো অভিযোগ ছাড়াই নিজের একাকিত্বকে চায়ের সাথে গিলে ফেলতে শেখে। বিকেলের আলো নিভে অন্ধকার নামে, আর মানুষটা খালি কাপ হাতে নিয়ে একা একা ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে।