অধ্যায় ১৭ভিড়ের ভেতরে হঠাৎ বিচ্ছিন্নতা
বন্ধুদের আড্ডা বা মিটিংয়ের মাঝখানে আচমকা সবাইকে পুতুল মনে হওয়া
ঘরভর্তি মানুষের তুমুল আড্ডা চলছে, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ হচ্ছে, কেউ একজন খুব মজার কোনো গল্প বলছে আর সবাই হো হো করে হাসছে। আপনিও সেই সোফায় বসে আছেন, আপনার মুখেও হাসি লেগে আছে। কিন্তু আচমকা, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আপনার কানের ভেতরকার সব শব্দ যেন জলের তলায় ডুবে যায়। চারপাশের মানুষগুলোর ঠোঁট নড়ছে দেখা যায়, কিন্তু মনে হয় আপনি যেন সিনেমার পর্দার বাইরে থেকে একদল দম দেওয়া পুতুলের নাচ দেখছেন।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে হয়তো ডিসোসিয়েশন বা বিচ্ছিন্নতা বলে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এ এক ভয়ংকর নিঃসঙ্গতার মুহূর্ত। শরীরটা ওই কোলাহলপূর্ণ ঘরেই পড়ে থাকে, অথচ মনটা এক ঝটকায় শরীর থেকে বেরিয়ে ঘরের কোণের সিলিংয়ে গিয়ে ভাসতে থাকে। সেখান থেকে নিচে তাকিয়ে নিজের ওই হাসিমুখের শরীরটাকেও সম্পূর্ণ পরের শরীর বলে মনে হয়।
কেন এমন হয়? যখন মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিজের আসল অনুভূতিগুলোকে চেপে রেখে কেবল সামাজিকতার খাতিরে মানুষের সাথে মেশে, তখন তার আত্মা একসময় বিদ্রোহ করে বসে। সে তখন জোর করে এই অপ্রয়োজনীয় কোলাহল থেকে নিজের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। চেনা বন্ধুদের মুখগুলো তখন হঠাৎ অচেনা লাগে, তাদের কথাবার্তাগুলোকে মনে হয় অর্থহীন শব্দের জঞ্জাল।
পাশের মানুষটি হয়তো তখন কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করে, কী রে, কোথায় হারিয়ে গেলি? আপনি তখন চমকে উঠে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসেন। একটু হেসে বলেন, কই, কোথাও না তো, শুনছি তো। অথচ আপনি জানেন, ওই কয়েক সেকেন্ডের জন্য আপনি আসলে এই পৃথিবী ছেড়ে এমন এক শূন্যলোকে চলে গিয়েছিলেন, যেখানে কোনো মানুষের কণ্ঠস্বর পৌঁছায় না।