পর্ব ২: নাগরিক ক্লান্তি, মুখোশ ও নীল আলোর ফাঁদ

অধ্যায় ২০সোশ্যাল মিডিয়ার শবাগার

ঝলমলে ছবির আড়ালে রক্তক্ষরণ ও লাইক-কমেন্টের নিচে চাপা পড়া কান্না

৪ মিনিট পাঠ

যে মানুষটি আজ বিকেলে গলায় দড়ি দিয়ে বা ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছে, তার প্রোফাইলে ঢুকলে দেখা যায় গতকাল রাতেও সে কোনো এক রেস্তোরাঁয় বসে হাসিমুখের ছবি দিয়েছিল। নিচে একশোটা মানুষ ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। মৃত মানুষের সেই জীবন্ত ও উজ্জ্বল ছবিটার দিকে তাকালে মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে যায়; মনে হয় আমরা সবাই মিলে এক বিশাল ডিজিটাল শবাগারে বসবাস করছি।

এখনকার যুগে মানুষের শোক বা আনন্দের কোনো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নেই, সবটাই প্রদর্শনী। সম্পর্ক ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, অথচ বিবাহবার্ষিকীর দিন ঠিকই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ছবি পোস্ট করতে হচ্ছে, কারণ লোকে কী বলবে! ভেতরে ভেতরে মানুষটা একাকিত্বে পচে গলে যাচ্ছে, অথচ সে প্রতিদিন নতুন পোশাক পরে পৃথিবীকে দেখাচ্ছে তার জীবনটা কতটা রঙিন। এই যে নিজের অসুখী জীবনটাকে সুখী দেখানোর প্রাণান্তকর কসরত, এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে?

আরও অদ্ভুত হলো মানুষের মৃত্যুর পর আমাদের শোক প্রকাশের ধরন। মানুষটা যখন বেঁচে ছিল, যখন সে আকারে-ইঙ্গিতে তার অসহায়ত্বের কথা জানাতে চেয়েছিল, তখন কারো সময় হয়নি তার পাশে বসার। অথচ তার মৃত্যুর খবর পাওয়ার সাথে সাথে সবাই তার সাথে তোলা পুরনো ছবি খুঁজে বের করে লম্বা লম্বা শোকগাথা লিখতে বসে যায়। সেখানেও আসলে মৃত মানুষটির জন্য মায়া যতটা না থাকে, তার চেয়ে বেশি থাকে নিজের সংবেদনশীলতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা।

দুদিন পর আবার সব শান্ত হয়ে যায়। মৃত মানুষটির প্রোফাইলটি অনন্তকালের জন্য ইন্টারনেটের এক কোণে ঝুলে থাকে এক ভূতুড়ে স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে। আমরা তার ছবি স্ক্রল করে পার হয়ে যাই এবং পরের ছবিতে গিয়ে আবার হাসির ইমোজি দিতে শুরু করি। লাইক আর কমেন্টের এই রঙিন কফিনের নিচে প্রতিদিন কত শত জীবন্ত মানুষের কান্না যে চাপা পড়ে যাচ্ছে, তার কোনো হিসাব মহাকালের খাতায় লেখা থাকে না।