অধ্যায় ৪০বয়সের সাথে আসা নির্লিপ্ততা
সময়ের মলম ক্ষত সারায় না, সময় শুধু ক্ষতকে সহ্য করার শক্তি এনে দেয়
কানের পাশের চুলে যখন রুপালি পাক ধরে এবং চোখের কোণে স্থায়ীভাবে কয়েকটা সূক্ষ্ম রেখা বসে যায়, তখন মানুষের বুকের ভেতরকার সেই পুরনো অস্থিরতাটাও হঠাৎ কেমন থিতিয়ে আসে। কুড়ি বছর বয়সে যে অপমানের কথা মনে পড়লে রাতের পর রাত বিছানায় ছটফট করতে হতো, চল্লিশ পেরোনোর পর সেই একই কথা মনে পড়লে মানুষ কেবল একটু ম্লান হাসে, তারপর পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে।
লোকে বলে সময় নাকি সব ক্ষত সারিয়ে দেয়। কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। সময় কোনো ডাক্তার নয়, সে কোনো ক্ষতই সারাতে পারে না। বুকের ভেতর যে গর্তটা তৈরি হয়েছিল, তা ঠিকই আগের জায়গায় থেকে যায়; সময় কেবল আমাদের সেই গর্তটার চারপাশে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করার অভ্যাস তৈরি করে দেয়। ব্যথাটা কমে না, কিন্তু ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতাটা অনেক গুণ বেড়ে যায়।
বয়স বাড়ার সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হলো এই নির্লিপ্ততা। যৌবনে মানুষ ভাবে, সবকিছুই বুঝি চিরস্থায়ী। সুখ এলে ভাবে এই সুখ বুঝি কোনোদিন ফুরাবে না, আর দুঃখ এলে ভাবে এই রাত বুঝি কোনোদিন পোহাবে না। কিন্তু জীবন যখন তার অর্ধেকটা পথ পেরিয়ে আসে, তখন মানুষ নিজের চোখেই দেখে নেয় কত শত ঝড় এসে আবার আপনিই থেমে গেছে। সে বুঝে যায়, এই পৃথিবীতে কোনো কিছুই চূড়ান্ত নয়।
তখন আর কেউ ছেড়ে গেলে তাকে পায়ে ধরে আটকানোর ইচ্ছে হয় না, কেউ প্রশংসা করলেও মাটিতে পা না পড়ার মতো আনন্দ হয় না। সবকিছুর দিকেই তখন একটু দূর থেকে, একটু নিরাসক্ত চোখে তাকানো যায়। এই যে আসক্তিহীন শান্ত দৃষ্টি, এ কোনো পরাজয় নয়; এ হলো আগুনের ভেতর দিয়ে হেঁটে আসা মানুষের অর্জিত পরম প্রজ্ঞা।