অধ্যায় ১২ভালো আছির নিখুঁত অভিনয়
প্রতিদিন সবাইকে ভালো থাকার প্রমাণ দিয়ে নিজের ভেতর ক্ষয়ে যাওয়া
কেমন আছো, এই প্রশ্নটা শোনার সাথে সাথে আমাদের ঠোঁটের কোণের পেশিগুলো যেভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওপরের দিকে বেঁকে গিয়ে একটা হাসির আকার নেয়, তা দেখলে যেকোনো দক্ষ অভিনেতাও লজ্জা পাবে। ভেতরে হয়তো তখন হৃৎপিণ্ডটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে, গত রাতে এক ফোঁটা ঘুম হয়নি, তবু গলা থেকে খুব মিষ্টি ও পরিষ্কার স্বরে বেরিয়ে আসে, এই তো, বেশ ভালো আছি। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রচলিত ও নিষ্ঠুরতম মিথ্যা হলো এই দুটি শব্দ।
আমরা কেন সত্যিটা বলি না? কারণ আমরা খুব ভালো করেই জানি, যে মানুষটি কুশল জিজ্ঞেস করছে, তার আসলে আমাদের সত্যিকারের খবর শোনার কোনো সময় বা আগ্রহ নেই। এটি একটি সামাজিক রীতি মাত্র। আপনি যদি ভুল করেও বলে বসেন যে আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে, আপনার বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে না, তবে সামনের মানুষটি ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়বে। সে তখন ঘড়ির দিকে তাকাবে, দুটো সস্তা সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে দ্রুত সেখান থেকে পালানোর পথ খুঁজবে। মানুষের এই অপ্রস্তুত মুখটা দেখার চেয়ে নিজের রক্তক্ষরণটুকু হাসির পর্দায় ঢেকে রাখাই আমাদের কাছে বেশি নিরাপদ মনে হয়।
কিন্তু প্রতিদিন এই ভালো থাকার প্রমাণ দিতে গিয়ে মানুষের ভেতরটা যেভাবে ক্ষয়ে যায়, তার হিসাব কেউ রাখে না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অফিসে, বাজারে, পারিবারিক আড্ডায় একটানা এই মুখোশটা পরে থাকতে থাকতে গালের চামড়া ব্যথা হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে চাবি ঘুরিয়ে যখন মানুষ নিজের অন্ধকার ঘরে ঢোকে, তখনই কেবল সে ওই ভারী মুখোশটা খুলে রাখার ফুরসত পায়।
তখন জুতো খোলারও শক্তি থাকে না। মেঝের ওপর কিংবা বিছানার এক কোণে ধপ করে বসে পড়লে মনে হয়, সারাদিন ধরে একটা মরা মানুষের লাশ কাঁধে করে বয়ে বেড়ানো হয়েছে। সমাজ চায় আমরা যেন সবসময় হাসিমুখে থাকি, কারণ বিষণ্ণ মানুষ কোনো কাজের নয়, সে শহরের সৌন্দর্য নষ্ট করে। তাই আমরা সবাই মিলে এক বিশাল সার্কাসের জোকার সেজে বসে আছি; আমাদের বুক ফেটে গেলেও তালি বাজানো থামানোর কোনো নিয়ম নেই।